২রা জুন, ২০২০ ইং, মঙ্গলবার, ১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৯ই শাওয়াল, ১৪৪১ হিজরী

শিরোনামঃ-

প্রবাসে দূতাবাসে অর্থ ছড়ালে দালালরাও সাহেব হয়ে যায়

Khorshed Alam Chowdhury

আপডেট টাইম : মে ০৩ ২০১৭, ০২:২৭ | 714 বার পঠিত

অর্পণ মাহমুদ,বিশেষ প্রতিনিধি-

লিবিয়া স্বৈরশাসক গাদ্দাফির সময়েও কতিপয় বাংলাদেশী কর্তৃক প্রবাসী বাংলাদেশীরা নানা ভাবে বিপদগ্রস্থ হয়েছে । সে সময়ও বিভিন্ন কোম্পানীতে চাকুরী দেয়ার নামে নানা ভাবে তারা হয়রানী করেছে এবং দেশ থেকে শ্রমিকদের নিয়ে এসে লিবিয়া পৌছানোর পর মরুভূমির মধ্যে তাদের ভাড়া করা ঘরে আটকে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা ঘটিয়েছে । তবে ঐ সব ঘটনায় তখন লিবিয়ানদের জরিত থাকার তেমন কোন প্রমান মেলেনি এবং লিবিয়ার প্রশাসনের ভয়ে চক্রটি খুব কৌশলে এমন দু-একটি ঘটনা ঘটিয়েছে । আর এসব চক্রের মূল ভূমিকায় যে সব বাংলাদেশী কাজ করেছে তাদের মধ্যে মেইন ভূমিকায় ছিল হাতে গোনা মাত্র কয়েক জন । তার মধ্যে নয়াখালীর হোসেন আলী, ঢাকার ইকবাল হোসেন ও পিচ্চি বাবুল, রংপুরের আল মামুন, মুন্সিগঞ্জের সিরাজ, পাকিস্তানী ইয়াছিন রতনসহ ডজন খানিক বাংলাদেশী । বেনগাজী থেকে ত্রিপলী, মিস্রাতাসহ লিবিয়ার সর্বত্র ছিল এদের আদিপত্য । যারা কয়েক বছরে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে কেউ বাংলাদেশে কেউ ইউরোপে পালিয়েছে, কারো জীবন গেছে লিবিয়ায়তেই । সে সময় ঐ চক্রের হোতারা লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস পরিচালিত ত্রিপলীতে বাংলাদেশ কমিউনিটি স্কুলে মোটা অংকের অনুদান দিয়ে তাদের প্রতারণার ব্যবসাটি জাহির করে নিয়ে ছিল এমন মন্তব্য শোনা গেছে লিবিয়ায় বসবাসরত অনেক বাংলাদেশীর কাছে থেকে । যা পরে লিবিয়াতে চাউর হয়ে যায় । ২০০৯ সালে লিবিয়ায় দূতাবাস ও বাংলাদেশ কমিউনিটি স্কুল কর্তৃক আয়োজিত বৈশাখী মেলাতেও তার প্রমান পাওয়া যায়, সে সময় মেলাতে হোসেন আলী, ইকবাল হোসেন, পিচ্চি বাবলু কে আলাদা আলাদা ভাবে ঘুরতে দেখেছি । এর আগে অনেক প্রবাসীদের মুখে শুধু তাদের নাম শুনেছিলাম, বাস্তবে দেখা হয় নি । কিন্তু ডজন ডজন বাংলাদেশী সিকিউরিটি নিয়ে ওই দালাদের মেলাতে ঘুরাফেরা দেখে সত্যিই কিছুটা আর্চায্যো হয়েছিলাম । ২০১০ সালের মাঝা মাঝিতে জাওয়াইয়া এক জন্মদিনের অনুষ্ঠানে হোসেন আলী ও ইকবাল হোসেনের সাথে আলাপের একপর্যায়ে তারা বলেছিল, লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতবাস তাদের কেনা, কিন্তু সমস্যা হলো লিবিয়ান পুলিশ । কারণ দিনার ছাড়ালেও লিবিয়াতে প্রশসনের কিছু সদস্যকে কেনা সম্ভব নয় । তাই খুব কৌশলে তাদের ম্যান পাওয়ারের ব্যবস্যা চালিয়ে যেতে হয় । গাদ্দাফি পতনের পর ২০১৩ সালে সাব্রাতার একটি অনুষ্ঠানে আবার দেখা হয়েছিল ইকবালের সাথে, দেশে স্ত্রী সন্তান থাকলেও লিবিয়ান এক মেয়েকে বিয়ে করে এবং স্ত্রী এক কন্যা সন্তানকে নিয়ে সেখান থেকেই মানব পাচারসহ নানা ব্যবসা চালিয়ে যেতে থাকে ইকবাল । তার অবৈধ ব্যবসার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে লিবিয়ান স্ত্রীকে । ইকবালের সাথে আলাপের একপর্যায়ে,কথা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেছিলাম, মানুষে আপনাদের দালাল বলে খারাপ লাগে না ? হেসেই খুব সহজেই উত্তর টা দিয়েছিল আর বলেছিল, মানুষে দালাল বললে কি আসে যায়, সামনে কেউ তো আর বলে না, এছাড়া সাধারণ শ্রমিকরা দালাল ভাবলেও দূতাবাসে আমাকে সাহেব বলে আক্ষা দেয়া হয় ! সে বলেছিল লিবিয়ান দূতাবাসে দিনার ছড়ালে সবই সম্ভব । তবে সে সময় আর তারা এক সাথে কাজ করে না যে যার মত নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে এবং নিজেকে ধুয়া তুলসী পাতা আক্ষা দিয়ে পিচ্চি বাবুল, হোসেন আলীসহ অন্যদের বিরুদ্ধে তাদের অবৈধ ব্যবসার লাখ লাখ দিনার ( কোটি কোটি টাকা ) হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ তুলেন । আর সে কারণেই নাকি সে এখন আলাদা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে এবং ওই ব্যবসার সব ধব ধরনের কাগজ পত্র করা হয়েছে তার লিবিয়ান স্ত্রীর নামেই এমনই জানিয়েছিল ইকবাল হোসেন । খোজ নিয়ে জানাগেছে, যুদ্ধ পরবর্তি ২০১২ -২৩ এদের বিরুদ্ধে ব্যবপক অভিযান চালায় লিবিয়ার প্রশাসন । এতে তারা বিভক্ত হয়ে পড়ে এছাড়া যুদ্ধের পর বিদেশী সব প্রতিষ্ঠান গুলো তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে চলে যায় । যে কারনে ভিবিন্ন প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক দিয়ে প্রতিমাসে কোটি কোটি টাকা কমিশন আদায় করে চলছিল বছরের পর বছর, সে অর্থ ভাগবাটোয়ারার পথও একেবারে বন্ধ হয়ে যায় । যে কারণে তারা বডিকন্টড়াক্টের মাধ্যমে দেশ থেকে লোক নিয়ে ইউরোপে পাচারসহ নানা অপরাধে জরিয়ে বিভক্ত হয়ে গ্রুপে গ্রুপে বিভিন্ন ধরণের অপকর্ম চালিয়ে যেতে থাকে । বাবুল, ইকবাল লিবিয়াতে কোটি টাকা খরচ করে লিবিয়ান মেয়ে বিয়ে করে স্ত্রীকে সার্পোট হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে এবং সেখানে আলিশান বাড়ি তৈরী করে বসবাস করতে থাকে । পাশাপাশি তাদের স্ত্রীর নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠা খুলে সেখানে বিলাসীভাবে জীবন যাপন করতে থাকে । এ সময়ে ইকবাল পিচ্চি বাবুল রা দেশ থেকে লোক নিয়ে যাওয়াসহ নানা প্রবাসী বাংলাদেশীদের সাথে প্রতারণার নতুন ফাঁদ বিস্তার করতে থাকে । এর মধ্যে লিবিয়ায় গত্রগত সংঘর্ষ লিবিয়ার বেশ কিছু জায়গাতে এক ভয়াভহ রুপ নেয় এবং সাব্রাতা ও বেনগাজী থেকে বেশ কয়েকজন দালাল কে লিবিয়ান প্রশাসন আটক করে । এমন সংবাদের পর হোসেন গাঢাকা দেয়, ইকবাল সপরিবারে ২০১৫ তে ইউরোপে পাড়ি জমাই এর কিছুদিন পর পিচ্চি বাবুল কে ১শ কোটি টাকা মুক্তিপণের দাবিতে একটি শক্তিশালী গ্রুপ অপহরণ করেছে এমন খবর আল জাওয়াইয়া ও সাব্রাতা এলাকায় বসবাসরত প্রবাসীদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে । এর কিছুদিন পর আবার খবর পাওয়া যায় মুক্তিপণ না পেয়ে পিচ্চি বাবুল কে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা । এর পাশাপাশি আরেকটি খবর শোনা যায় যে,পিচ্চি বাবুলের অঢেল অর্থ হাতিয়ে নিতেই তার লিবিয়ান স্ত্রীই অপহরণ করিয়েছে । আবার কেউ কেউ বলতে থাকে তার স্ত্রী লিবিয়ান পুলিশ দিয়ে বাবুল ধরিয়ে দিয়ে গোপনে দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে । তবে এর কোন খবরেরই এখনো সত্যতা পাওয়া না গেলেও বাবুলের স্ত্রীর এসময়ে লিবিয়ার বেশ কিছু উচ্ছূখল ছেলেদের সাথে বেপরোয়া চলাফেরা দেখে বাবুল নিখোঁজের পিছনে স্ত্রীর হাত আছে বলে তার দিকে এমন সন্দেহের আঙ্গল তুলে বাংলাদেশী প্রবাসী ও স্থানীয় কিছু লিবিয়ানরা । এক সময়ে যারা ইকবাল, হোসেন আলী, পিচ্চি বাবুলসহ লিবিয়ায় নাম করা দালালদের আশ্রয় পশ্রয়ে থেকে তাদের নির্দেশে প্রবাসী বাংলাদেশীদের উপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছে,ঐ সব নির্যাতনকারীরাই এখন লিবিয়ায় বাংলাদেশীদের অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়,পাচারসহ নানা অপকর্মের গডফাদার বনে গেছে । আর তাদের আড়ালে আর্থের ভাগ নিয়ে প্রত্যক্ষ ও পরক্ষভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছে লিবিয়ার কতিপয় প্রশাসন । যে সব লিবিয়ান ক্রিমিনাল বাংলাদেশী চক্রের পিছনে কাজ করছে, তাদেরকে এই পথে নিয়ে আসার পিছনেও বাংলাদেশী চক্রই দায়ি । বাংলাদেশিদের ব্যাপারে লিবিয়ানরা এতোটা খারাপ ছিলোনা । বাংলাদেশিদের ব্যাপারে লিবিয়ানদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশিরাই তৈরী করে দিয়েছে । ম্যানপাওয়ারের ব্যবসায় লিবিয়ানদের বিরাট অংকের ঘুষের নেশা এই বাংলাদেশিরাই সর্বপ্রথম শিখিয়েছে । হাজার হাজার মাইল দূর থেকে আসা অসহায় বাংলাদেশী শ্রমিকদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের চিন্তা লিবিয়ান ক্রিমিনালদের মাথায় বাংলাদেশিরাই ঢুকিয়ে দিয়েছে । তারই নির্মমতার শিকার হচ্ছ এখন প্রবাসীরা । এদানিং মূল হোতারা গাঢাকা দিয়েছে । কিংবা আড়াল থেকে ওই সব সন্ত্রাসীদের কলকাটি নাড়াচ্ছে কিনা সেটাও পরিস্কারনয় । তবে ঐ সময়ে প্রবাসীদের নির্যাতন, নানা ভাবে হয়রানীসহ বিভিন্ন ধরণের অপকর্ম চালিয়ে আসা ঐ চক্রের সদস্যরাই আজ প্রবাসী বাংলাদেশের কাছে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে । এখন কিছু লিবিয়ান অবৈধপন্থায় প্রবাসীদের কাছে থেকে হাজার হাজার দিনার-অর্থ আদায়ের কৌশল শিখে তারা অসহায় প্রবাসীদের একের পর এক বিপদগ্রস্থ করে তুলছে । এটা সত্য যে লিবিয়ানরা এক সময় ঘুষ কি জিনিস তা মুখে আনতে ভয় পেতো না, এটা এক শ্রেনীর বাংলাদেশীরাই শিখিয়েছে । প্রবাসে কাজ কর্মের ক্ষেত্রে ছাড়াও বাংলাদেসীদের ব্যবহারে লিবিয়ানরা বিশেষ সুনজরেই দেখতো । এখনো অনেকেই সে সুনজরেই দেখন ! যে কারণে লিবিয়ায় কর্মরত অধিকাংশই বাংলাদেশিদের সহযোগিতা করে, মুখে মুখে চুক্তি হওয়া কাজের বিনিময় মাস শেষে নগদ অর্থ এখনো দিয়ে দেয় অনেক লিবিয়ান । হাজার মাইল দূর থেকে আসা অসহায় বাংলাদেশী শ্রমিকদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের চিন্তা লিবিয়ান ক্রিমিনালদের মাথায় ঢুকিয়ে বাংলাদেশী চক্র মানবপাচার,অপহরণ,পুলিশে ধরিয়ে অর্থ আদায়সহ কিভাবে লিবিয়াতে অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে অনুসন্ধানে তাও উঠে এসেছে ……… চলবে

Please follow and like us:

পাঠক গনন যন্ত্র

  • 3843710আজকের পাঠক সংখ্যা::
  • 45এখন আমাদের সাথে আছেন::

সর্বশেষ খবর

এ বিভাগের আরও খবর

প্রধান সম্পাদক- খোরশেদ আলম চৌধুরী, সম্পাদক- আশরাফুল ইসলাম জয়,  উপদেষ্টা সম্পাদক- নজরুল ইসলাম চৌধুরী।

ঢাকা অফিস : রোড # ১৩, নিকুঞ্জ - ২, খিলক্ষেত, ঢাকা-১২২৯,

সম্পাদক - ০১৫২১৩৬৯৭২৭,০১৮৮০৯২০৭১৩

Email-dailynayaalo@gmail.com

প্রধান সম্পাদক কর্তৃক  প্রচারিত ও প্রকাশিত

সাইট উন্নয়নেঃ ICTSYLHET