৩০শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, শুক্রবার, ১৪ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১২ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪২ হিজরি

[gtranslate]

শিরোনামঃ-

গ্রেফতার আটকে উপেক্ষিত আদালতের নির্দেশনা

Khorshed Alam Chowdhury

আপডেট টাইম : জুন ১৩ ২০১৬, ০৬:২০ | 673 বার পঠিত

untitled-1_16013_1465760178নয়া আলো ডেস্ক- ‘স্যার, আমার পোলা একেবারে ছোট, ১২ বছর বয়স। ঢাকার কিছুই চিনে না। অথচ পুলিশ কয় হে নাকি গাঞ্জা বেচে’- একথা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন ষাটোর্ধ্ব নূরজাহান বেগম। যুগান্তরকে তিনি বলেন, ‘বুধবার থেইক্যা পোলাডারে খুঁইজা পাই না। কত জায়গায় না খুঁজছি। কিন্তু কেউ কইতে পারে না। পরে শুক্রবার এক লোক ফোন কইরা কইলো তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় খবর নিতে। কিন্তু থানায় গেলে পুলিশ প্রথমে ঢুকতেই দেয়নি। পরে এক পুলিশকে কিছু ট্যাহা দিয়া ভেতরে ঢুইক্যা দেহি আমার পোলা লোহার শিকের মধ্যে এক কোণায় বইস্যা রইছে। আমারে দেইখ্যা সে কি কান্না। চিক্কুর পাইরা শুধু কান্দে।’
রোববার পুরনো ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণে যুগান্তরকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন ১২ বছরের শিশু মো. আলীর মা নূরজাহান বেগম। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মো. আলীর মতো প্রতিদিন শত শত মানুষকে গ্রেফতার করলেও উচ্চ আদালতের নির্দেশনার তোয়াক্কা করছে না পুলিশ। গ্রেফতারের পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে আদালতে হাজির করার বিধান থাকলেও সেটি অনুসরণ করা হচ্ছে না। এমনকি আটকের পর ছেড়ে দেয়া অথবা গ্রেফতার দেখানো- সবই চলছে পুলিশের ‘ইচ্ছেমাফিক’ সেই আগের নিয়মে।
পুলিশ সদর দফতরের হিসাব অনুযায়ী, শুক্রবার থেকে দেশব্যাপী পরিচালিত জঙ্গি ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে গত ৪৮ ঘণ্টায় গ্রেফতার হয়েছেন ৫ হাজার ৩২৪ জন। এর মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলোর সদস্য রয়েছেন মাত্র ৮৫ জন। বাকিদের নাশকতার ঘটনাসহ বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
যুগান্তরের বিভিন্ন ব্যুরো অফিসের পাঠানো তথ্যমতে, গত ৪৮ ঘণ্টায় গ্রেফতাকৃতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মী রয়েছেন। গ্রেফতার আতংকে এ দু’দলের অনেকেই বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। কোনো কোনো এলাকায় গ্রেফতার বা আটক করার ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, গ্রেফতারের পর সংশ্লিষ্ট আসামিকে আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করতে দেয়ার বিধান থাকলেও তা করা হচ্ছে না। শুধু তাই নয়, গ্রেফতারের পর আসামির স্বজনকেও জানানোর প্রয়োজন মনে করছে না পুলিশ।
উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কাউকে আটকের পর এক ঘণ্টার মধ্যেই টেলিফোনে কিংবা বিশেষ বার্তা বাহকের মাধ্যমে তার নিকটাত্মীয়কে জানানোর কথা। এছাড়া ৩ ঘণ্টার মধ্যেই সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে গ্রেফতারের বিষয়টি জানানো, পছন্দসই আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করতে দেয়া, আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা সাদা পোশাকে গ্রেফতার অভিযানে না যাওয়া এবং কাউকে গ্রেফতারের সময় সংস্থার প্রকৃত পরিচয় দেয়াসহ ১৫ দফা নির্দেশনা রয়েছে উচ্চ আদালতের। ওই নির্দেশনার মধ্যে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে আদালতে হাজির ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ নির্দেশনা।
রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় চলতি মাসে (জুন) এসআই হাবিবুল্লাহ খান বাদী হয়ে ১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা করেন। মামলা নম্বর-১৮। তারিখ-০৮/৬/২০১৬। ওই মামলায় দু’জনকে আসামি করা হয়েছে। এরা হচ্ছেন- মো. আলী (১২) ও মো. ইয়াছিন। মামলাটির নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায় ৮ জুন ওই মামলায় আসামিদের গ্রেফতার দেখানো হলেও আদালতে হাজির করা হয়েছে ১২ জুন। এছাড়া নিকটাত্মীয়কে জানানোর প্রয়োজন মনে করেননি সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ। তবে মামলার বাদী এসআই হাবিবুল্লাহ খান নির্দিষ্ট সময়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে যুগান্তরের কাছে দাবি করেন।
এছাড়া রোববার দুপুরে মিন্টো রোডে গোয়েন্দা কার্যালয়ের সামনে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় জুরাইন ৩৯৮ নম্বর খন্দকার রোডের বাসিন্দা গৃহবধূ বিউটি আক্তারের সঙ্গে। যুগান্তরকে তিনি বলেন, শনিবার বিকাল ৩টার দিকে জুরাইনের মুরাদপুর এলাকা থেকে সাদা পোশাকে ১২-১৪ জন লোক তার স্বামী আমির হোসেনকে আটক করে। পরে হাতকড়া পরিয়ে তাকে বাসায় নিয়ে আসে।
বিউটি আক্তার বলেন, সাদা পোশাকে ওই ব্যক্তিরা নিজেদের পুলিশের লোক পরিচয় দিয়ে বাসায় ব্যাপক তল্লাশি চালায়। পরে তার স্বামীকে বাসা থেকে বের করে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নিয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, শনিবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে তার স্বামী ফোনে তাকে (বিউটি) জানান, তাকে মিন্টো রোডে ডিবি অফিসে আনা হয়েছে। এ খবর পেয়ে বিউটি আক্তার সন্ধ্যায় ডিবি অফিসে আসেন।। কিন্তু ডিবির গেট থেকে তার স্বামীর বিষয়ে খোঁজ নিলেও কেউ কোনো তথ্য দিতে পারেনি।’
বিউটি জানান, তার স্বামীকে কয়েকজন যুবক শনিবার বিকালে যখন বাসায় নিয়ে তল্লাশি চালায় তখন তাদের সাদা পোশাক ছিল। গায়ে ডিবি লেখা পোশাক ছিল না। কিন্তু এক ব্যক্তি বিউটিকে বলেছিলেন, তারা পুলিশের লোক। তার স্বামী ইয়াবা ব্যবসায়ী। তাই তাকে আটক করা হয়েছে। বিকাল সাড়ে ৫টায় স্বামীর ফোন পেয়ে সন্ধ্যায় ডিবি অফিসে ছুটে যান বিউটি। স্বামীর সন্ধান না পেয়ে তার মোবাইল ফোনে কল দিয়ে বন্ধ পান তিনি। অবশেষে সেখান থেকে ফিরে যান বাসায়। রোববার সকালে শাশুড়ি ও ছোট মেয়েকে নিয়ে স্বামীর খোঁজে আবার ডিবির গেটে যান বিউটি। তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমার স্বামী অন্যায় করে থাকলে আটক করুক, কিন্তু তার সন্ধান তো আমাদের দেয়া হবে। কিন্তু তার সন্ধানই পাচ্ছি না। ডিবি অফিসের গেট থেকে বলা হয়েছে, তারা কিছু জানেন না। ডিবি থেকেও তার কাছে তার স্বামীর বিষয়ে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি বলে দাবি বিউটির।
টাঙ্গাইল প্রতিনিধি রেফাজুর রহমান জানান, উচ্চ আদালতের আদেশ অমান্য করে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার হুগড়া গ্রাম থেকে খোকা ও মুকুল নামের দুই সহোদরকে ১৭ দিন আটক রেখে নির্যাতন করে বলে অভিযোগ উঠেছে। টাঙ্গাইলের র‌্যাব-১২ এর একটি দল ২৪ মে স্বতন্ত্র ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী মোরশেদ আলম দুলালের প্রচারণা চালানোর সময় সহস্রাধিক মানুষের সামনে থেকে হুগড়া গ্রামের মরহুম খোরশেদ আলমের দুই ছেলে খোকা ও মুকুলকে আটক করে বলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিল বলে র‌্যাব ওই সময় জানায়। আটককৃতদের চাচা শামীম আল মামুন জুয়েলের অভিযোগ, আটকের পর থেকে অস্ত্র উদ্ধারের নামে তার দুই ভাতিজাকে প্রতিদিন নির্যাতন করা হতো। তিনি আরও জানান, ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অস্ত্রের কথা স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। অবশেষে চলমান সাঁড়াশি অভিযানের মধ্যেই ১১ জুন (শনিবার) খোকা ও মুকুলকে অস্ত্র মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে টাঙ্গাইল মডেল থানায় সোপর্দ করে র‌্যাব। তবে তাদের গ্রেফতার দেখানো হয় ১০ জুন শুক্রবার।
টাঙ্গাইল সদর মডেল থানার এসআই আল মামুন জানান অস্ত্র মামলায় খোকা ও মুকুলকে র‌্যাব-১২ থানায় সোপর্দ করে। পরে অফিস নিয়ম-কানুন মেনে রোববার সকালে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের গারদখানার দায়িত্বপ্রাপ্ত এসআই রুহুল যুগান্তরকে বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ডিএমপিসহ ঢাকা জেলার বিভিন্ন থানা এলাকা থেকে মোট ৯৬ জনকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। এদের মধ্যে ৪০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ রিমান্ড আবেদন করে। তবে আদালত শুনানি শেষে ২৯ জনকে রিমান্ডে দিয়েছেন বলে তিনি জানান।

Please follow and like us:

পাঠক গনন যন্ত্র

  • 4166204আজকের পাঠক সংখ্যা::
  • 13এখন আমাদের সাথে আছেন::

সর্বশেষ খবর

এ বিভাগের আরও খবর

প্রধান সম্পাদক- খোরশেদ আলম চৌধুরী, সম্পাদক- আশরাফুল ইসলাম জয়,  উপদেষ্টা সম্পাদক- নজরুল ইসলাম চৌধুরী।

ঢাকা অফিস : রোড # ১৩, নিকুঞ্জ - ২, খিলক্ষেত, ঢাকা-১২২৯,

সম্পাদক - ০১৫২১৩৬৯৭২৭,০১৮৮০৯২০৭১৩

Email-dailynayaalo@gmail.com

প্রধান সম্পাদক কর্তৃক  প্রচারিত ও প্রকাশিত

সাইট উন্নয়নেঃ ICTSYLHET