২রা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, বুধবার, ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৬ই রবিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি

[gtranslate]

শিরোনামঃ-

একজন মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিকের আতœসমর্পণ

হুমায়ন আরাফাত, আশুলিয়া করেসপন্ডেন্ট।

আপডেট টাইম : আগস্ট ০২ ২০১৭, ২১:৪২ | 616 বার পঠিত

লেখক: সৈয়দ মুন্তাছির রিমন
কবির ভাষার বলতে চাই-
“উদয়ের পথে শুনি কার বানী
ভয় নাই ওরে ভয় নাই
নি:শেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই”।

৩ আগষ্ঠ ? দেশ প্রেম মানুষের সহজাত চেতনা। স্বদেশের প্রতি আমৃত্যু থাকে প্রবল আকর্ষণ আর প্রকৃত দেশপ্রেমিক মৃত্যুর পরও মৃত্যুজয়ী রুপে সমাদৃত হতে থাকেন। তাই বাঙালীর স্বাধীনতা ও অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে। যে কোন দেশের জনগণের স্বাধীনতা কিছু স্বার্থন্বেষী মহল ও বিজাতির আক্রমনে অধিকার বিপন্ন হয় । কাল পরিবর্তনে জাতিকে তার স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়ার জন্য প্রত্যেক যুগে যুগে মহামানবের জন্ম হয়। ঠিক তেমনী অনুরুপ ইতালির গ্যারিবল্ডি, আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন, রাশিয়ার লেনিন, চীনের মাও সেতুং, তুরস্কের কামাল পাশা, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, প্যালেষ্টাইনের ইয়াসির আরাফাত প্রমূখ এর জন্ম হয়েছে। তাদের মতই বাঙালী জাতির অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম হয়। তিনিই স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক ৭ মার্চে আহবান করেছেন।
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম”
বঙ্গবন্ধুর এই জ্বালাময়ী আহবানে তথাকথিত কিছু কুলাঙ্গার ছাড়া সমগ্র বাঙালী তার স্বাধীনতার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। তেমনী সেই সব মুক্তিকামী বাঙলীদের একজন শ্রীমঙ্গলবাসীর জনপ্রিয় নেতা সৈয়দ ফারুক আহমদ। তিনি তার জীবনের অধিকাংশ সময় দেশ ও জাতির কল্যাণে ব্যয় করেছেন। তিনি দেশের আধ্যাত্মিক ভূবনের রাজধানী সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার সীমান্তবর্তী পাহাড়ী ঝর্ণার আবাসভূমি বড়লেখা উপজেলার দাসের বাজার ইউনিয়নের লঘাটি গ্রামের শত শত বছরের ঐতিহ্য মন্ডিত খোজার মসজিদের সৈয়দ বাড়ীতে ১৯৫০ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা সৈয়দ আহমদ কনু মিয়া ও মাতা ছালেহা বিবি চৌধুরী। তার পিতা সৈয়দ আহমদ কনু মিয়া ১৯৫৩ সালে আওয়ামী মুসলিমলীগের রাজনীতিতে অংশ গ্রহণ করেন। তারপর ১৯৭১ সালে তার নেতৃত্বে স্বাধীনতার সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয় এবং তিনি স্থানীয় ভাবে নেতৃত্ব দেন। কিন্তু যুদ্ধ চলাকালীন সময় চান্দ্রগ্রাম বাজার থেকে পাকবাহিনী তাকে ধরে নিয়ে বধ্যভূমিতে হত্যা করে। সৈয়দ ফারুক আহমদ বোন-ভাই আট জনের মধ্যে প্রথম সন্তান ছিলেন। কিন্ত বাবার শোক তাকে বিচলিত করতে পারেনি। তবুও দেশ ও জাতির কল্যাণে যুদ্ধে লিপ্ত হন। তিনি শৈশব কালে খোজার মসজিদে ধর্মীয় শিক্ষা ও সুড়ীকান্দি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষা জীবন শেষ করে বড়লেখা পি.সি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
১৯৬২ সালে এই স্কুলে ছাত্র থাকা অবস্থায় আইয়ুব বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়ার অপরাধে তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তাই শ্রীমঙ্গলে বড় ভাইর বাসায় চলে যান। শ্রীমঙ্গলে ভিক্টোরিয়া স্কুলে ভর্তি হয়। সেখানে লেখা-পড়ার পাশাপাশি ব্যবসা বানিজ্য দেখা শুনাসহ রাজনীতিতে জড়িয়ে পরেন। সে স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করে ১৯৬৪ সালে সামরিক আইন বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার নেতৃত্ব দেন। ১৯৭০ সালে নির্বাচনে আওয়ামীলীগের বিজয় নিশ্চিত করার জন্য দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭১ সালে পাকিন্তানী বাহিনীর রণ কৌশলে ২৫ মার্চের কালো রাত্রির জন্ম হয়। ২৭ মার্চ শ্রীমঙ্গলে বিশাল মিছিল ও ২৮ মার্চ মুক্তিসংগ্রাম পরিচালনা কমিটি গঠন করার নেতৃত্ব দেন। এপ্রিলের শেষ দিকে পাক বাহিনী শ্রীমঙ্গল দখল করলে চলে যান ভারত। করিমগঞ্জের লোহারবন ট্রেনিং সেন্টার থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে সি,আর, দত্ত ও এন জেড চৌধুরীর অধীনে ৪নং সেক্টরের বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ এলাকার কুকিরতল যুদ্ধে অংশ গ্রহন করেন। ৭১ সালের যুদ্ধকালিন সময় তাহার সহযোদ্ধা ছিলেন বড়লেখার এম,এ হাছিব চৌধুরী ও এম আর সাদী। শ্রীমঙ্গল উপজেলার প্রথম ট্রেনিং ইন্সপেক্টর গাইড হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং স্বাধীনতা অর্জনের পর স্বেচ্ছা সেবক বাহিনীর শ্রীমঙ্গলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালে জাসদ রাজনীতির সাথে জড়িত হয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলার জাসদের এমপি হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদন্ধিতা করেন। কিন্তু সেই নির্বাচনে মাত্র ছয় ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তাকে গ্রেফতার করা হয়। তাকে শ্রীমঙ্গল কারাগার থেকে সিলেট জেলে প্রেরণ করা হয়। তখন সে স্থানে বেশি দিন রাখা হয়নি। কুমিল্লা কারাগারে কর্ণেল তাহেরের সাথে তার সাক্ষাত হয়। বিপ্লবী সৈনিকের সাথে একান্ত নিরিবিলি কথোকপথন হয়। কিছু দিন পর দুই জনই দুদিকে বিভক্ত হয়ে যান। তিনি ১৯৭৮ সালে অঙ্গিকার নামার মধ্যমে মুক্তিলাভ করেন। ১৯৮০ সালে জীবনের নতুন অধ্যায় সুচনা করেন। সংগ্রামী সৈনিক নেপথ্যে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অবদান রাখেন।
১৯৯০ সালে শ্রীমঙ্গলের দৈনিক খোলা চিঠি পত্রিকার বার্তা সম্পাদক ও পরবর্তীতে প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এর সাথে দৈনিক পূবালীবার্তা সম্পাদক ও সাপ্তাহিক শ্রীমঙ্গলের চিঠি পত্রিকার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি ব্রাকটাকের পরিচালক, সমাজ কল্যাণের প্রতিনিধি পরিষদের পরিচালক এসপিও এসপি, এনজিও সংস্থার কো-অর্ডিনেটর হিসেবে শ্রীমঙ্গল উপজেলার দায়িত্ব গ্রহণ করে মানুষের কল্যাণে নিয়োাজিত ছিলেন। সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালনকালে ২০০২ সালের ৩ আগষ্ট তার ক্ষত বিক্ষত প্রায় দুই মাসের গলিত লাশ শ্রীমঙ্গল পুলিশ উদ্ধার করে। শ্রীমঙ্গলে তার নিজ হাতে গড়া অসংখ্য সংগঠন ও নেতাকর্মী তাকে স্মরণ করে আজও অশ্রুসিক্ত হয়। তিনি আজকের শ্রীমঙ্গলের প্রতিষ্টিত ব্যক্তিদের দাদা হিসেবে পরিচিত। তাদের অধিকাংশের মন্তব্য তিনি একজন ত্যাগি নেতা এবং তার জীবন সংসারের জন্য কিছু করেননি। তিনি সারাটা জীবন মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করে গেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে প্রায় সাতশত মুক্তিযোদ্ধার কমান্ডার ছিলেন। কিন্তু খন্দকার মোশতাক আহমদের সরকার তাকে শ্রীমঙ্গল ডাক বাংলোতে জনসমুদ্রে অসংখ্যা নির্যাতন করে। তবে তার এই করুণ মৃত্যু প্রত্যাশা ছিলনা। এই সংগ্রামী সৈনিক জীবনে ক্ষমতার শীর্ষ স্থান দখল করার পরেও নিজের জন্য বিলাসিতা করেননী।
তিনি তার জীবনে অন্যায়-অবিচার ও স্বার্থের কাছে তার মাথা নথ হয়নি। বরং তিনি সততা, ন্যায় পরায়ণতা ও আদর্শ্যে কাছে আতœসমর্পণ করেছেন। আগামী প্রজন্ম যারা সাংবাদিকতায় আত্মনিয়োগ করবে তাদের জন্য ১০টি নীতি লিখেছেন। তার নিজ অবিজ্ঞতা থেকে লেখা ডায়েরীর পাতা থেকে পাঁচটি উল্লেখ করা হল। যেমন:
১। সাংবাদিকদের রাজনীতি করতে নেই। ইহা করল পেশার ইজ্জত নষ্ট হয়।
২। মদ স্পর্শ করতে নেই। ইহা করলে সমাজের উচু তলার মানুষেরা পাইয়া বসে।
৩। কারো কোন খবর চাপাইয়া দেওয়ার ওয়াদা করতে নেই।
৪। বেশি ও চটকদার খবরের আশায় এখানে-সেখানে যাইতে নেই।
৫। সাংবাদিকতা পেশা কে অন্য পেশা, বৃত্তি বা ব্যবসার মাধ্যম বানাইতে নেই।
বর্তমান সরকারের আমলে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা ও সনদ প্রদান করলেও তার পরিবারটি বঙ্গবন্ধুর হাতে স্বাক্ষরিত শহীদ পরিবারের সার্টিফিকেট হারিয়ে তা পুন:দ্বার এবং মুক্তিযোদ্ধার পরিবার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া একান্ত প্রয়োজন।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
তথ্যসূত্র ঃ উইকিপিডিয়া, শ্রীমঙ্গলীকা, দৈনিক সমকাল, মানবজমিন, বাংলাবাজার ও যুগান্তর প্রমূখ।

Please follow and like us:

পাঠক গনন যন্ত্র

  • 4217524আজকের পাঠক সংখ্যা::
  • 4এখন আমাদের সাথে আছেন::

সর্বশেষ খবর

এ বিভাগের আরও খবর

প্রধান সম্পাদক- খোরশেদ আলম চৌধুরী, সম্পাদক- আশরাফুল ইসলাম জয়,  উপদেষ্টা সম্পাদক- নজরুল ইসলাম চৌধুরী।

ঢাকা অফিস : রোড # ১৩, নিকুঞ্জ - ২, খিলক্ষেত, ঢাকা-১২২৯,

সম্পাদক - ০১৫২১৩৬৯৭২৭,০১৮৮০৯২০৭১৩

Email-dailynayaalo@gmail.com

প্রধান সম্পাদক কর্তৃক  প্রচারিত ও প্রকাশিত

সাইট উন্নয়নেঃ ICTSYLHET